সড়ক নিরাপত্তায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

বিবিধ

গত ৫ আগস্ট ২০১৯, প্রথম আলোর আয়োজনে এবং উবারের সহযোগিতায় ‘সড়ক নিরাপত্তায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হলো।দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কীভাবে আরও কমিয়ে অানা যায়, সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। দুর্ঘটনা রোধে কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, আরও কী করা প্রয়োজন, সেসবই আজকের আলোচনার বিষয়। আমাদের সবার নিয়মের মধ্যে চলা জরুরি। নিয়ম মেনে চললে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটা কমে যাবে। উবার এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। পরিবহন খাতের চাহিদা পূরণে তারা এগিয়ে এসেছে। পাশাপাশি সড়কে নিরাপত্তা কার্যকর করা এবং এ বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার লক্ষ্যে সবাবইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। এখন এ বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত করবেন মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ।সড়কে মৃত্যুর হার আগের চেয়ে কমেছে। কিন্তু সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কার্যক্রম বেড়েছে কি না, সেটা দেখা প্রয়োজন। চলাচলের সময় সঠিকভাবে সড়ক ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন হতে হবে। ৯৯৯ বাংলাদেশে সম্পূর্ণ নতুন একটি সেবা। যুক্তরাষ্ট্রে আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে ৯১১ ছিল। তাদের থেকে ৭০ বছর পরে হলেও আমাদের ৯৯৯ সেবা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে।সড়ক দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে নাগরিক হয়রানিসহ প্রায় সবকিছুতেই পাশে থাকার চেষ্টা করছে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯। প্রয়োজনের মাত্রা অনুসারে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর চেষ্টা করছি।

কিন্তু সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও আমাদের কিছু অপারগতা আছে। ঢাকায় একজন নাগরিক বিপদে পড়লে আমাদের ডাকেন। কিন্তু রাস্তার দুরবস্থা ও অতিরিক্ত যানজট ঠেলে তাঁর কাছে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগছে। সেবা দ্রুত দেওয়ার জন্য বিকল্প কোনো রাস্তার ব্যবস্থাও নেই। শতকরা ২৫ ভাগ রাস্তার জায়গায় মাত্র ৮ ভাগ রাস্তা আছে। সেটিও অব্যবস্থাপনা-অসংগতির কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী। কিন্তু অবকাঠামোগত দিক থেকে না পারলেও কৌশলগত দিক থেকে সেবা দ্রুত পৌঁছাতে চেষ্টা করা হচ্ছে।বিভিন্ন থানার যে টহল গাড়ি ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো রয়েছে, সেগুলোতে এমডিটি ডিভাইস (অবস্থান শনাক্তকরণ যন্ত্র) স্থাপন করছি। এর মাধ্যমে টহল গাড়ি ও সাহায্যের জন্য ফোন দেওয়া নাগরিকের দূরত্ব সহজে জানা যাবে। তার কাছে সরাসরি সেবা পৌঁছানোর জন্যই এই ব্যবস্থা।বর্তমানে আমরা পরীক্ষামূলকভাবে ৯২টি গাড়িতে এই ডিভাইস স্থাপন করেছি। আরও ২০০ ডিভাইস ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। উবারসহ অন্যান্য রাইড শেয়ারিং কোম্পানির সঙ্গে ৯৯৯ সংযুক্ত হতে যাচ্ছে। এতে যাত্রী, চালক ও গাড়ি প্রত্যেকের নিরাপত্তাই দ্রুত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এখন ৯৯৯-এর কার্যক্রম সম্পর্কে সব স্তরের জনগণকে আরও বেশি করে জানাতে হবে। এর ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।কারও একার পক্ষে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না। নীতিনির্ধারক, গণমাধ্যম, সরকার, পুলিশসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এ–সংক্রান্ত সমস্যা শনাক্ত করে সম্ভাব্য সমাধানগুলো কার্যকর করতে হবে। তিন বছর ধরে উবার বিশ্বস্ততার সঙ্গে জনগণের পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে সেবা চালুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে উবার। উবারের প্রথম চেষ্টা ছিল নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ তৈরি করা।

যাত্রীরা অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই চালকের তথ্য, ছবি ও গাড়ির নম্বর পেয়ে যাচ্ছেন। এটি যাত্রীদের স্বস্তি এনে দিচ্ছে। অনেক চালক রাস্তায় গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল চালানোর নির্ধারিত নিয়ম সম্পর্কে জানেন না। সেদিক থেকে উবার তাঁদের দিচ্ছে রোড সেফটি অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম।চালকদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাঁদের চোখে সমস্যা। তাঁদের শনাক্তকরণের জন্য বিনা মূল্যে চক্ষু পরীক্ষা কার্যক্রম রয়েছে। এ ছাড়া চশমা প্রয়োজন হলে কম মূল্যে চশমা প্রদান করা হয়।সড়ক নিরাপত্তার জন্য উবারের কিছু পদক্ষেপ আছে। তার মধ্যে একটি হলো, প্রত্যেক বাইকচালককে দুটি করে হেলমেট প্রদান করা।এতে চালক ও তাঁর সহযাত্রী দুজনেরই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতে হয়। কারণ, নিয়মের কার্যকারিতা তাঁরাই রক্ষা করেছে।উবার একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তার পক্ষে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এখানে বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। তাঁদের পরামর্শগুলো সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করার জন্য ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস ডিকেড অব রোড সেফটি অ্যাকশন প্ল্যান’ একটি প্রকল্প হাতে নেয় । পাশাপাশি জাতিসংঘ ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট একই পদক্ষেপ নিয়েছে ২০২০ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। এই দুই প্রকল্পের লক্ষ্য প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা শতকরা ৫০ ভাগ কমানো।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে সড়ক দুর্ঘটনা রোধের নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ অনেক প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ড হাতে নিয়েছে। সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনার হার অনেকটাই কমে যাবে। বর্তমানে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বছরে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০টি দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এ সংখ্যা আরও বেশি। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ও ডিকেড অব অ্যাকশন ফর রোড সেফটির লক্ষ্য পর্যালোচনা এবং পরবর্তী দশকের লক্ষ্য নির্ধারণের উদ্দেশ্যে একটি কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়েছে। যেটি আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত হবে।আমাদের দেশে সাধারণ যানবাহনের তুলনায় ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার বেশি। সে ক্ষেত্রে জনগণের নিরাপত্তা মাথায় রেখে যাতায়াতের চাহিদা পূরণ করছে উবার। সরকারের অনুরোধে ব্র্যাক অত্যাধুনিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ স্কুল চালু করেছে। সেখানে মোটরসাইকেল চালনা প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে উবার। এখন পর্যন্ত ৪৪ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।এখনো বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশ চালকের লাইসেন্স হয় নকল, না হয় লাইসেন্সই নেই। লাইসেন্স তদারকের ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের তৎপর হতে হবে। ব্র্যাক ড্রাইভিং স্কুলের আরেকটি বড় প্রকল্প হলো ফোর হুইলস টু ফ্রিডম। এর উদ্দেশ্য হলো নারী চালকদের ড্রাইভিং পেশায় নিয়ে আসা। কারণ, উন্নত দেশগুলোয় চালকদের ওপর জরিপ করে দেখা গেছে, পুরুষ চালকদের চেয়ে নারী চালকেরা বেশি নিরাপদ ও সহনশীল।এখানে গ্রামাঞ্চল থেকে নেওয়া অসহায়, অসচ্ছল, তালাকপ্রাপ্ত নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একেকজনের জন্য প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়। এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৬০০ নারী চালক ড্রাইভিং স্কুল থেকে স্নাতক হয়েছেন। তাঁদের সবাই এখন ভালো জায়গায় কাজ করছেন। বেশির ভাগ আছেন বহুজাতিক কোম্পানিতে। আমাদের জানামতে, এখন পর্যন্ত তাঁদের দ্বারা বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।

ড্রাইভিং সেক্টর পুরুষনির্ভর হওয়ায় যৌন হয়রানিসহ অনেক ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। লিঙ্গ ভারসাম্যের জন্য এমন একটা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দুটি বাধা রয়েছে। একটি চালকের অসচেতনতা, অন্যটি জনগণের অসচেতনতা। জনগণকে রাস্তায় চলাচলের নিয়মগুলো জানতে হবে। পাশাপাশি মেনে চলার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।আমাদের বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বর্তমানে কেবল তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যক্রমে বিষয়টি রয়েছে। বাকি শ্রেণিগুলোয় অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রম চলছে। আরও একটি বিষয় উবার আমাদের সামনে এনেছে। সেটা হলো চালকদের দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা।ব্র্যাক ও জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনালের (জেসিআই) সমন্বিত উদ্যোগে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের ১ হাজার ২০০ চালকের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ৫০ শতাংশ চালকের দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা রয়েছে।ওই ৫০ ভাগের মধ্যে আবার ৭৬ ভাগের চশমা নেওয়া প্রয়োজন। ১৩ ভাগের চোখে অস্ত্রোপচার করা দরকার। কিন্তু তারা চশমা ও অস্ত্রোপচার ছাড়াই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন।দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার জটিলতার কথা মাথায় রেখে ব্র্যাক সুপারিশ করেছে চালকদের লাইসেন্স নবায়নের সময় যেন তাঁদের চোখ পরীক্ষা করা হয়। আবার পরিবহনমালিক কিংবা শ্রমিক সমিতির তৎপরতার মাধ্যমেও সেটি করা যায়।সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে আমরা যেন অগ্রাধিকারের কথা ভুলে না যাই। সমন্বিত উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে কিছু বিষয় জানতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে কাজ করার অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং, জনসচেতনতা, আইন প্রয়োগ ইত্যাদি।

একজন প্রকৌশলী হিসেবে কোনো কিছু তৈরির সময় আমরা যেন কোনো ঘাটতি না রাখি। সে ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্রটাকে শুরুতে রাখছি। রাস্তাগুলো এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেন আইন ভঙ্গের সুযোগ না থাকে। তাহলে দুর্ঘটনার হার কিছুটা হলেও কমে যাবে।পাশাপাশি, ধারাবাহিকভাবে সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ন্যাশনাল রোড সেফটি কাউন্সিল দুর্ঘটনা হ্রাসে ও শৃঙ্খলা আনতে ১১১টি সুপারিশ প্রদান করেছে। গত ২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই সুপারিশ হস্তান্তর করা হয়েছে।উবার কিংবা বিভিন্ন রাইড শেয়ারিংয়ের চালকদের ক্ষেত্রে একটা অভিযোগ আমরা প্রায়ই শুনতে পাই। তারা গ্রাম থেকে চলে এসেছে, তাদের সঠিক জ্ঞানের অভাব। তাদের ক্ষেত্রে যেন স্ক্রিনিং ও প্রশিক্ষণ সঠিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।আমাদের রিসার্চ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং কোম্পানিকে ও তাদের চালকদের নির্দিষ্টসংখ্যক আসনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য নির্দেশিকা তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণের ব্যাপারে তাদেরও আগ্রহ বাড়ছে।২০১১ সালের ১৩ আগস্ট বাংলাদেশের দুজন প্রথিতযশা মানুষ তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। সেই বাসটি ২০১১ সালের ১০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টায় চুয়াডাঙ্গা থেকে ছেড়ে ভোর সাড়ে ৬টায় ঢাকা পৌঁছায়। সেটিই আবার সকাল সাড়ে ১০টায় চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশে যাত্রা করে। মানিকগঞ্জের ঘিওরে দুর্ঘটনাটি ঘটে।স্বাভাবিকভাবেই একজন মানুষের কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা বিশ্রাম দরকার। সেখানে একজন গাড়িচালক টানা সাত ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর কত সময় বিরতি পেয়েছেন? তারপর আবার তাঁর ওই ভারী স্টিয়ারিং হাতে নিতে হয়েছে।

দুর্ঘটনা রোধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা ও আইন প্রয়োগ। এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে আইনের প্রয়োগ খুব শিথিল। আগে ৩০২ ধারা মোতাবেক দুর্ঘটনার শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। বিভিন্ন চাপে সেটাকে তিন বছরের সাজা করা হয়েছে। এখানে মানুষ প্রাধান্য পায়নি, পেয়েছে বাণিজ্য।আইন প্রণিত হয় ২০১৭ সালে। কিন্তু লাল ফিতার দৌরাত্ম্য পেরিয়ে এখন পর্যন্ত এটি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও সচেতনতা দরকার।আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। চালকের শুধু চোখ পরীক্ষা করালেই হবে না। চালক শারীরিকভাবে সমর্থ কি না, সেটাও যাচাই করে নিতে হবে। যে গাড়িটি থেকে মালিক আয় করছেন, সেই গাড়িটির ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স ঠিক আছে কি না, সেটি যাচাই করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশকে এ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স হতে হবে।জনগণের সচেতনতাও জরুরি। তাড়াহুড়ার সময় আমরা চালককে জোরে চালাতে বলি। তখন চালকদেরও আর কিছু করার থাকে নাবাংলাদেশে চালকদের বেতনবৈষম্য দেখা যায়। একই কোম্পানির সাধারণ বাসচালকদের বেতন মার্সিডিজ কিংবা ভলভোর চালকদের বেতন থেকে খুবই কম।আরও একটি সমস্যা হলো আমাদের দেশে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার রীতি নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আদালত রায় দেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ সেটা মানতে চান না।প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১৭টি নির্দেশনা রয়েছে। সেটাও যদি আমরা ঠিকভাবে মেনে চলি, তবু দুর্ঘটনার হার কমে যাবে।ইদানীং রাইড শেয়ারিং চালকদের মধ্যে অ্যাপস ব্যবহারের প্রবণতা কম দেখা যাচ্ছে। তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের মতো ভাড়া নিয়ে চালাতে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।সে ক্ষেত্রে সড়কের নিরাপত্তা ব্যাহত হবে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের ছাত্ররা যেমন জেগেছে, তেমনি জাগার দরকার আমাদেরও।

সড়ক দুর্ঘটনায় শারীরিক ও মানসিক দুই ধরনের সমস্যা হয়। মানসিক আঘাতগুলোই পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মানসিক আঘাতের প্রতি আমরা গুরুত্বারোপ করি না।সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের রাতে ঘুম না হওয়া, হতাশা—নির্দিষ্ট কোনো কিছু দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যেতে পারে। এসবের কারণে বিভিন্ন হরমোনাল পরিবর্তন হয়। এটা শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে।অনেকে মস্তিষ্কে হালকা আঘাত (মাইল্ড ব্রেন ইনজুরি) পায়। এদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজন ছয় মাসের মধ্যে মানসিক চাপের মতো ব্যাধিতে আক্রান্ত (সাইকোলজিক্যাল স্ট্রেস ডিজঅর্ডার) হয়ে থাকে। এগুলো যে কারও মধ্যে দেখা যেতে পারে। যারা সরাসরি ভুক্তভোগী, যারা সাহায্যার্থে এগিয়ে আসে, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মী সবারই এটা হতে পারে।অনেকের আগে থেকেই মানসিক আঘাতজনিত সমস্যা (প্রিভিয়াস সাইকিয়াট্রিক ট্রমা) থাকে। তাদের ওপর এসব ঘটনার প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।এক জার্নালে দেখেছিলাম, বাংলাদেশের গাড়িচালকদের ৬০ শতাংশ তেমন লেখাপড়া জানে না। তাদের মধ্যে আবার কিশোর বয়সী চালক বেশি। তাদের বেশির ভাগই বেপরোয়া এরং অনেকই মাদকাসক্ত। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম আরেকটি কারণ হলো রাস্তাগুলোর বাজে অবস্থা।মানসিক রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। তবে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই নিয়মিত মানসিক মূল্যায়নের (সাইকোলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট) ভেতর দিয়ে যেতে হবে। সাইকিয়াট্রিস্ট অথবা কাছের মানুষের কাছে মন খুলে সমস্যাগুলো বলতে হবে।
দৈনন্দিন কাজের ভেতরে থাকতে হবে। আঘাতপ্রাপ্ত ও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েলে তা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। বিভিন্ন থেরাপির মাধ্যমে এসব মানসিক সমস্যার সমাধান সম্ভব।আলোচনায় নিরাপত্তা বিষয়টি দুভাবে এসেছে। সেটা হলো সুরক্ষা ও নিরাপত্তা। এতক্ষণ যে আলোচনা হলো, তা আমাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবিষয়ক। সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক নয়।গাড়িতে চড়ে কোথাও গেলে আমরা ব্যক্তিগত জানমালের নিরাপত্তার কথা ভাবি। সড়ক নিরাপত্তা নয়। সড়ক যোগাযোগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে সমস্যাগুলো শনাক্ত করতে হবে।আমাদের দেশের একটা ইতিবাচক দিক হলো মদ্যপ হয়ে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার নজির তেমন নেই। বাইরের দেশগুলোতে প্রায় ৮০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে মদ পানের কারণে। কিছু দুর্ঘটনা রাস্তার নকশার ওপর নির্ভর করে। তবে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেটাও খুব বেশি নয়।

বাইরের দেশগুলোতে বিভিন্ন প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নানা ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৃষ্টি ও শীতকালে কুয়াশা ছাড়া আর তেমন কোনো সমস্যা নেই। বাংলাদেশে ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি হয়।এখানে চালকেরা অতিরিক্ত টাকা অর্জনের পেছনে ছোটেন। এর জন্য বিশ্রামের সময়েও তাঁরা গাড়ি চালান। এতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের বিশ্রামের চাহিদা পূর্ণ হয় না। তাই অবসাদগ্রস্ততা থেকে দুর্ঘটনা ঘটে।আন্তজেলা চলাচলকারী বাস-ট্রাকের চালকেরা ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্তও গাড়ি চালান। বর্তমানে নতুন একটি নির্দেশনা এসেছে। আন্তজেলা চলাচলকারী বাসগুলোতে দুজন করে চালক থাকতে হবে। যদিও এটি কার্যকর হয়নি।আইনের শিথিলতা সত্যিকার অর্থেই চালকদের বেপরোয়া মনোভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। সংসদে কিছু আইন পাস হচ্ছে। কিন্তু মালিক, শ্রমিক ও পরিবহন সমিতির চাপে পড়ে সরকার সেটি বাস্তবায়ন করতে পারছে না।ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে সরকারি কোনো নিয়ম নেই। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের জন্য কোনো আপিল হলে আদালত সেটিকে যথাযথ মূল্যায়ন দেন। কিন্তু পরিবহনমালিক ও শ্রমিক সমিতির চাপে সেটাও রক্ষা হয় না।অনেক ক্ষেত্রে বাসের সঙ্গে দুর্ঘটনায় পথচারী আঘাত পান। আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির পক্ষে আদলত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য রায় দিলেও মালিকেরা সেটা মানেন না। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। সবার আগে আইনের প্রয়োগ সঠিকভাবে নিশ্চিত করা উচিত।পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসনকেন্দ্র (সিআরপি) শুধু বাংলাদেশে নয়, এই উপমহাদেশের একমাত্র পুনর্বাসনকেন্দ্র। এখানে রোগীর একেবারে প্রাথমিক ধাপ থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে বহু ধাপে (মাল্টিডিসিপ্লিনারি) চিকিৎসা চলে।বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে রোগীর শারীরিক সক্ষমতা যতটুকু সম্ভব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। আমাদের চিকিৎসাপদ্ধতি শুধু রোগীর শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা পর্যন্তই শেষ নয়।

একেবারে শেষ ধাপে এসে রোগীর শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করা হয়। এরপর তাঁদের প্রয়োজন ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে তাঁদের কাজের সুযোগও তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।কাজের ক্ষেত্রে সব ধরনের সাহায্য সিআরপি থেকে দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসা শেষে কিছু রোগীকে নির্বাচন করা হয় বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের জন্য। ২০১৮ সালে সিআরপিতে ৩১১ জন রোগী ভর্তহয়।আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা খুব দীর্ঘমেয়াদি। এই কারণে খুব বেশিসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা একই সঙ্গে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।একেকজন রোগীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য তিন-চার মাস সময় লাগে। অন্যকে দোষারোপ না করে নিজেদের দায়িত্বগুলোর প্রতি মনোযোগী হতে হবে।তবেই সমস্যাগুলো থেকে দ্রুত উত্তরণ সম্ভব। কোনো দুর্ঘটনা যেন সারা জীবনের বোঝা না হয়, সে জন্য সিআরপি সব সময়ই আপনাদের পাশে রয়েছে।বাংলাদেশ আঘাত প্রতিরোধ ও গবেষণা কেন্দ্র (সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ) মূলত একটি পাবলিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট। আমরা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অবদান রাখার চেষ্টা করছি। সেই সঙ্গে উন্নয়ন ও বাস্তবায়নেও কাজ করছি।দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সঠিক তথ্যগুলো আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার। ২০১৫ সালে সরকারি হিসাবমতে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজর ৪০০। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) শেষ প্রতিবেদন-২০১৮ অনুযায়ী এই সংখ্যা ২৪ হাজার। বাংলাদেশ আঘাত প্রতিরোধ ও গবেষণাকেন্দ্রের হিসাবমতে, প্রতিবছর প্রায় ২৩ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দুর্ঘটনা ঘটার ৩০ দিনের মধ্যে কেউ মারা গেলে সেটি দুর্ঘটনায় নিহত হিসেবে ধরা হয়। আমাদের দেশের প্রতিবেদনপদ্ধতিতে ঘটনাস্থলে কেউ মারা গেলে সেগুলোই শুধু প্রতিবেদনে আসে।তথ্য সংগ্রহের প্রায় ৬৯টি পদ্ধতি আছে। সংগ্রহকারীরা এসব নিয়ম ভালোভাবে জানেন না। তথ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ করার জন্য একটা মানসম্মত পদ্ধতি ব্যবহার করা দরকার। এতে তথ্যগুলো একই ধরনের হয়।এসব তথ্য সঠিকভাবে পাওয়ার পর নীতিমালায়ও কিছু পরিবর্তন আসবে। দুই হাজারের জন্য যে নীতি, দশ হাজারের জন্য সে নীতি কোনো কাজেই আসবে না।দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতাল–পূর্ববর্তী সেবা দিতে হয়। এটাকে আমরা গোল্ডেন আওয়ার বলে জানি। হাসপাতালে যেতে যেতেই এ সময় পার হয়ে যায়। দুর্ঘটনার এক-তৃতীয়াংশ তখনই মারা যান। এর অন্যতম কারণ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ।সামান্য কিছু প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে এ মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা যায়।শুরুতেই আসি উবারের মোটরসাইকেল চালনা বিষয়ে। একটি রাইডে থাকা অবস্থায় চালককে আমরা পরবর্তী কোনো রাইডের জন্য কখনোই সংকেত পাঠাই না। যেন কোনোভাবেই চালকের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত না ঘটে। রাইডে থাকাকালীন যেন তাকে মুঠোফোন চেক করতে না হয়, সেই জন্যই এই ব্যবস্থা।উবারের মোটরসাইকেলের চালক ও যাত্রী দুজনেরই হেলমেট পরা আমরা বাধ্যতামূলক করেছি। এতে দেখা গিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক কমে এসেছে। চালক ও যাত্রী উভয়কে বাধ্যতামূলক হেলমেট পরার নিয়মের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তায় অনেক ভূমিকা রাখছে উবার।
আলোচনায় এসেছে চালকের দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। সবার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমাদের চালকদের আমরা বিনা মূল্যে চক্ষু পরীক্ষা করছি। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুবিধা দেওয়ারও চেষ্টা করছি।সবার কাছ থেকে আমরা যে প্রশংসা পাচ্ছি, তার জন্য আমরা অনুপ্রাণিত। অনুপ্রেরণা কাজের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলছে। উবারের একটি গ্লোবাল সেফটি টিম রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক নানা নিয়মকানুন রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি পরিস্থিতি বুঝে ঢাকায় ও অন্যান্য শহরে যতটুকু সম্ভব সেসব নিয়মকানুনের কিছুটা প্রয়োগ করতে।সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক আমাদের কর্মসূচিগুলো কেবল কর্মসূচিই নয়। এগুলো আমাদের ভবিষ্যতের জন্য একটা পুঁজি। আশা করি আমরা সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব।